বাংলাদেশে পড়াশোনা শেষ করে কেবল একটি ডিগ্রির সার্টিফিকেটের জোরে চাকরির আশা করার দিন এখন পুরোপুরি ফুরিয়ে গেছে। প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রায় ২২ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও তাদের বিপরীতে নতুন আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি হচ্ছে মাত্র ৬-৭ লাখ। পরিসংখ্যানটি ভয়ের মনে হলেও, এর পেছনের মূল কারণটি বোঝা জরুরি। এই বেকারত্বের বড় একটি কারণ হলো ‘দক্ষতার অভাব’ বা স্কিল মিসম্যাচ। আমাদের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় ইন্ডাস্ট্রির দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদার সাথে তাল মেলাতে পারছে না, ফলে একজন শিক্ষার্থী যা শিখে বের হচ্ছেন আর কর্মক্ষেত্রে যা প্রয়োজন—তার মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে গতানুগতিক ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের চেয়ে সেবা (Service), ই-কমার্স, লজিস্টিকস এবং আইসিটি (ICT) খাতে কাজের সুযোগ অনেক দ্রুত বাড়ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে অটোমেশন ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ক্লারিক্যাল, টাইপিং বা সাধারণ ডেটা এন্ট্রির কাজগুলো এখন সফটওয়্যারের দখলে চলে যাচ্ছে। এর পরিবর্তে বাড়ছে বিশ্লেষণধর্মী ও কৌশলগত কাজের চাহিদা। তাই শুধুমাত্র বিবিএ বা বিএসসি ডিগ্রির ওপর নির্ভর না করে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডেটা অ্যানালাইসিস, সাইবার সিকিউরিটি, এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন খাতগুলোর দিকে ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো এখন সময়ের দাবি। মনে রাখবেন, এখনকার নিয়োগকর্তারা আপনার জিপিএ দেখেন কেবল শর্টলিস্ট করার জন্য; কিন্তু চাকরিটা দেন এটা দেখে যে আপনি তাদের ব্যবসার কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করতে পারেন কি না।
চাকরি খোঁজার কৌশল হিসেবে এখন আর শুধু একটি ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, আপনাকে হতে হবে মাল্টি-চ্যানেল জব সিকার। বিডিজবস মতো সাইটগুলো অবশ্যই দেখবেন, তবে এন্ট্রি লেভেলের চাকরির জন্য ‘সম্ভব’ (Shomvob) এবং ‘স্কিল ডট জবস‘-এর মতো নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বেশ কার্যকর। আর আপনি যদি মাল্টিন্যাশনাল বা রিমোট জবের স্বপ্ন দেখেন, তবে লিঙ্কডইন (LinkedIn) বা গ্লাসডোর নিয়মিত ভিজিট করতে হবে। তবে শুধু প্রোফাইল খুলে রাখলেই হবে না, সেখানে নিজেকে সক্রিয় রাখতে হবে—নিজের ইন্ডাস্ট্রির বিষয়ে পোস্ট করা, মন্তব্য করা এবং উপস্থিতি জানান দেওয়া জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আবেদন করলে রিক্রুটারের নজরে পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। এছাড়া বর্তমান যুগে অনেক বড় কোম্পানি মানুষের বদলে ‘অ্যাপ্লিকেন্ট ট্র্যাকিং সিস্টেম’ (ATS) নামক সফটওয়্যার ব্যবহার করে সিভি বাছাইয়ের জন্য। তাই প্রতিটি চাকরির বিজ্ঞপ্তির ভাষা পড়ে, সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ‘কি-ওয়ার্ড’গুলো (যেমন: Project Management, Python, Sales Growth) আপনার সিভিতে অন্তর্ভুক্ত করে কাস্টমাইজড সিভি জমা দেওয়া এখন বাধ্যতামূলক।
বর্তমান বাজারে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হলো কেবল ইন্টারভিউ রুমের দরজা খোলার ‘এন্ট্রি পাস’, কিন্তু সেই রুমে টিকে থাকার ‘আসল কারেন্সি’ হলো আপনার স্কিল বা দক্ষতা। এক্সেল (অ্যাডভান্সড লেভেল), পাইথন, পাওয়ার বিআই বা এসইও-এর মতো হার্ড স্কিলগুলো আপনাকে কাজ করতে সাহায্য করবে। কিন্তু কাজ পাওয়ার পর প্রমোশন পেতে বা দল টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সফট স্কিল—যেমন যোগাযোগ দক্ষতা, নেগোসিয়েশন, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এবং টিমওয়ার্ক। এই স্কিলগুলো অর্জনের জন্য এখন আর নতুন করে চার বছরের ডিগ্রির প্রয়োজন নেই।
কোর্সেরা (Coursera), ইউডেমি বা গুগলের প্রফেশনাল সার্টিফিকেট কোর্সগুলোই যথেষ্ট। তবে শুধু কোর্স করলেই হবে না, নিয়োগকর্তারা এখন সার্টিফিকেটের চেয়ে ‘প্রুফ অফ ওয়ার্ক’ বা কাজের প্রমাণ দেখতে বেশি আগ্রহী। আপনি যদি প্রোগ্রামার হন তবে গিটহাবে আপনার কোড রাখুন, ডিজাইনার হলে বিহান্সে পোর্টফোলিও তৈরি করুন, আর কন্টেন্ট রাইটার হলে মিডিয়াম বা লিঙ্কডইনে আপনার লেখা প্রকাশ করুন। এই ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ আপনার হয়ে কথা বলবে।
আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এমন অনেক উন্নতমানের ট্রেনিং ও প্লেসমেন্ট প্রোগ্রাম রয়েছে যা সরাসরি চাকরির সুযোগ তৈরি করে দেয়, কিন্তু প্রচার ও তথ্যের অভাবে অনেকেই সেগুলোর সুফল নিতে পারেন না। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি SICIP (Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program) প্রজেক্টটি ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা অনুযায়ী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অ্যাডভান্সড ট্রেনিং দিচ্ছে। এটি বিখ্যাত SEIP প্রজেক্টের সফল উত্তরসূরি হিসেবে কাজ করছে এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সাথে সরাসরি সংযোগ থাকায় এখান থেকে প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির নিশ্চয়তা অনেক বেশি। এছাড়া যারা শহরের বাইরে আছেন বা উদ্যোক্তা হতে চান, তাদের জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর (DYD) দেশজুড়ে আইসিটি, গবাদিপশু পালন ও মৎস্য চাষের মতো ট্রেডে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, অনেক গ্র্যাজুয়েট আছেন যারা কাজ জানেন কিন্তু ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে নার্ভাস হয়ে যান। তাদের জন্য ‘পাসপোর্ট টু জব (Axis Meta)’, ব্র্যাক স্টার প্রোগ্রামগুলো ‘ফিনিশিং স্কুল’ হিসেবে চমৎকার কাজ করে।
চাকরি পাওয়ার এই কঠিন যাত্রায় একা লড়াই না করে পেশাদার কারো সাহায্য নেওয়া বা ‘ক্যারিয়ার কোচিং’-এর সুবিধা নেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি। ক্যারিয়ার কোচরা আপনাকে আপনার লক্ষ্য বা গোল ঠিক করতে, পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং তৈরি করতে এবং আবেদনের সঠিক কৌশল শিখিয়ে চাকরিতে প্রবেশের পথ সহজ করে দেন। ক্যারিয়ার কোচ রা সেন্টারে ব্যক্তিগত বা দলীয় সেশনের ব্যবস্থা থাকে।
এখানে সিভি অপ্টিমাইজেশন থেকে শুরু করে ইন্টারভিউতে ‘STAR’ মেথড (Situation, Task, Action, Result) ব্যবহার করে কীভাবে গুছিয়ে উত্তর দিতে হয়, তা শেখানো হয়—যা আপনার কনফিডেন্স বা আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কারিগরি বা TVET সেক্টরের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘RAISE‘ প্রজেক্টের কোচরা শিক্ষানবিশদের ট্রানজিশন এবং সঠিক নিয়োগকর্তার সাথে সংযোগ করিয়ে দিতে কাজ করছেন।
পাশাপাশি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এখন আর শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিটি সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ‘ডেডিকেটেড প্লেসমেন্ট অফিসার’ বা ক্যারিয়ার অফিসার থাকাটা এখন সময়ের দাবি, যা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা দিতে পারে। এই অফিসাররা এমপ্লয়্যার ডেটাবেস তৈরি, জব ফেয়ার আয়োজন এবং ইন্টারভিউ প্রস্তুতির কাজগুলো করেন। এমনকি ‘কোবো টুলবক্স’ (KoBo Toolbox)-এর মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা ‘ট্রেসার স্টাডি’ পরিচালনা করেন বা ট্র্যাক করেন যে শিক্ষার্থীরা পাশ করার পর কোথায় যাচ্ছেন। ই
কারিগরি বা TVET সেক্টরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর (DYD), বিটিইবি (BTEB)-এর আরটিও (RTO) এবং এনএসডিএ (NSDA)-এর পার্টনাররা সরাসরি ইন্ডাস্ট্রির সাথে সমন্বয় করে ওয়েজ আর্নিং বা আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। এই উদ্যোগগুলো স্কিল মিসম্যাচ দূর করে এবং টিমওয়ার্কের মতো সফট স্কিলগুলো নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের এমপ্লয়্যার-রেডি করে তোলে।
সবশেষে, ‘নেটওয়ার্কিং’-এর শক্তিকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়; একে বলা হয় ‘লুকানো চাকরির বাজার’। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ চাকরির বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় আসার আগেই পরিচিত, রেফারেন্স বা অভ্যন্তরীণ নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হয়ে যায়। তাই লিঙ্কডইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক বা বিভিন্ন প্রফেশনাল গ্রুপ ও ইভেন্টগুলোতে নিজের পরিচিতি বাড়ান। আর যদি এখনই মনের মতো কর্পোরেট চাকরি না পান, তবে হতাশ হয়ে ঘরে বসে থাকবেন না। আপওয়ার্ক, ফাইভার বা লোকাল মার্কেটপ্লেসে আপনার স্কিল অনুযায়ী ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে পারেন। ছোট ছোট প্রজেক্ট, ভলান্টিয়ারিং বা ইন্টার্নশিপ আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারী করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।
মনে রাখবেন, ২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাকরি কেউ প্লেটে সাজিয়ে দেবে না—ডিজিটাল টুলস, সঠিক হাই-ডিমান্ড স্কিল, ক্যারিয়ার কোচিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজের যোগ্যতা দিয়েই তা আদায় করে নিতে হবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, শেখা থামাবেন না, সাফল্য আসবেই।